চীনে বাসা ভাড়া নেবেন কীভাবে? ২০২৬ সালের সম্পূর্ণ গাইড | বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের জন্য

চীনে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা দীর্ঘ সময় থাকার পরিকল্পনা করছেন? তাহলে ভিসা ও ফ্লাইটের টিকিটের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো থাকার জন্য উপযুক্ত বাসা খুঁজে নেওয়া।
বাংলাদেশে আমরা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, হোস্টেল, মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকার সঙ্গে পরিচিত। চীনেও একই ধরনের কিছু ব্যবস্থা আছে। তবে বাসা খোঁজা, বাড়িওয়ালার সঙ্গে যোগাযোগ, অগ্রিম ভাড়া পরিশোধ এবং চুক্তি করার নিয়মে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
বিশেষ করে প্রথমবার চীনে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষাগত সমস্যা, মোবাইল পেমেন্ট এবং বিদেশি নাগরিকদের আবাসন নিবন্ধন সম্পর্কে জানা জরুরি।
আপনি যদি MBBS, ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্য কোনো ডিগ্রির জন্য চীনে যাচ্ছেন, অথবা নতুন চাকরি শুরু করতে যাচ্ছেন, তাহলে এই গাইড আপনাকে সঠিক বাসা খুঁজতে সাহায্য করবে।
এখানে আমরা আলোচনা করব চীনে কোথায় বাসা খুঁজবেন, কোন অ্যাপ ব্যবহার করবেন, শুরুতে কত টাকা লাগতে পারে এবং ভাড়ার চুক্তি করার আগে কী কী বিষয় যাচাই করা উচিত।
আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের চীনে বাসা ভাড়া নেওয়ার সম্পূর্ণ গাইড (ইংরেজিতে) পড়ুন।
১. চীনে থাকার জন্য কোন ধরনের বাসা বেছে নেবেন?
চীনে থাকার জায়গা নির্বাচনের আগে নিজের বাজেট, বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসের অবস্থান এবং কত দিনের জন্য থাকবেন, তা বিবেচনা করুন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল বা ডরমিটরি (Student Dormitory)
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অনেকেই চীনে যাওয়ার পর প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে ওঠেন।
বিশেষ করে MBBS, ইঞ্জিনিয়ারিং বা চীনা ভাষার কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সুবিধাজনক হতে পারে। সাধারণত ক্লাসে যাওয়া সহজ হয় এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতেও সাহায্য করে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মানেই হোস্টেলে সিট নিশ্চিত হওয়া নয়।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবেদন করতে হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা সীমিত থাকায় আগে আবেদন করা জরুরি।
আপনি যদি Chinese Government Scholarship (CSC) বা অন্য কোনো বৃত্তি পেয়ে থাকেন, তাহলে সেটির আওতায় থাকার ব্যবস্থা বা আবাসন ভাতা দেওয়া হবে কি না, আগে নিশ্চিত করুন।
হোস্টেলে ওঠার আগে কয়েকটি বিষয় জেনে নিন। যেমন, একটি রুমে কতজন থাকবেন, বাথরুম আলাদা কি না, রান্না করা যাবে কি না এবং ছুটির সময় হোস্টেলে থাকা যাবে কি না।
শেয়ার ফ্ল্যাট (合租 — Hēzū)
বাংলাদেশে মেসে থাকার মতো চীনে শেয়ার ফ্ল্যাট বেশ প্রচলিত।
এখানে আপনি একটি অ্যাপার্টমেন্টের আলাদা বেডরুম ভাড়া নিতে পারবেন। রান্নাঘর, বসার ঘর এবং কখনো বাথরুম অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।
চীনা ভাষায় একে বলা হয় 合租 (Hēzū)।
যারা একা একটি সম্পূর্ণ ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে চান না বা খরচ কমাতে চান, তাঁদের জন্য এটি ভালো বিকল্প।
তবে রুমমেটদের জীবনযাপন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস এবং রান্নার ব্যবস্থা আপনার সঙ্গে মানানসই কি না, তা আগে জেনে নিন।
সম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট (整租 — Zhěngzū)
আপনি যদি নিজের মতো থাকতে চান, পরিবারের সঙ্গে থাকেন অথবা বাসা থেকে কাজ করেন, তাহলে সম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে পারেন।
চীনে একে বলা হয় 整租 (Zhěngzū)।
এতে রান্নাঘর, বাথরুম ও অন্যান্য জায়গা নিজের মতো ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। তবে একটি রুম ভাড়া নেওয়ার তুলনায় খরচ সাধারণত বেশি হয়।
স্বল্পমেয়াদি বাসা ও সাবলেট
আপনি যদি কয়েক মাসের জন্য চীনে থাকেন, তাহলে স্বল্পমেয়াদি ভাড়া বা সাবলেটের বিকল্পও দেখতে পারেন।
সাবলেটের ক্ষেত্রে একজন বর্তমান ভাড়াটিয়া তাঁর ভাড়া নেওয়া বাসা বা রুম অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেন।
এ ধরনের ব্যবস্থা করার আগে মূল বাড়িওয়ালার অনুমতি আছে কি না এবং ভাড়ার চুক্তিতে সাবলেটের অনুমতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল ও ক্যাম্পাসের বাইরে থাকার বিকল্প সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের চীনে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবাসন গাইড (ইংরেজিতে) পড়ুন।

২. চীনের কোন শহর ও এলাকায় বাসা খুঁজবেন?
চীনে বাসাভাড়া শহর ও এলাকার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে।
বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো বড় শহরে সাধারণত ভাড়া বেশি। অন্যদিকে উহান, চেংদু এবং কিছু অন্যান্য শহরে তুলনামূলক কম খরচে থাকার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
তবে শুধু কম ভাড়া দেখেই বাসা নির্বাচন করা উচিত নয়।
আপনি যদি শিক্ষার্থী হন, তাহলে প্রথমে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঠিক ক্যাম্পাস কোথায় অবস্থিত, তা জেনে নিন। অনেক চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্যাম্পাস রয়েছে এবং সেগুলো শহরের বিভিন্ন এলাকায় হতে পারে।
বিশেষ করে MBBS শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতের ক্লিনিক্যাল ক্লাস বা টিচিং হাসপাতালের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো বাসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে হলে প্রতিদিন যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে।
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে অফিসের দূরত্ব, মেট্রো স্টেশনের অবস্থান এবং আশপাশে প্রয়োজনীয় দোকানপাট আছে কি না, সেগুলো বিবেচনা করা উচিত।
বিভিন্ন শহরে বাসার বিকল্প দেখুন
আপনি সাংহাই (Shanghai) বা বেইজিং (Beijing) যাচ্ছেন? তাহলে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মস্থলের আশপাশের এলাকায় বাসা খুঁজুন।
উহান (Wuhan), গুয়াংজু (Guangzhou) ও চেংদু (Chengdu)-র মতো শহরেও বিভিন্ন বাজেটে শেয়ার ফ্ল্যাট এবং সম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যায়।
চীনে বাসা খোঁজার সময় Amap (高德地图) বা Baidu Maps (百度地图) ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অফিস পর্যন্ত যেতে কত সময় লাগবে, তা দেখে নিতে পারেন।
মনে রাখবেন, ম্যাপে দূরত্ব কম দেখালেও একাধিক মেট্রো পরিবর্তন করতে হলে যাতায়াতে বেশি সময় লাগতে পারে।
৩. চীনে বাসা খোঁজার জন্য কোন অ্যাপ ব্যবহার করবেন?
বাংলাদেশে অনেকেই পরিচিতজন, স্থানীয় দালাল, ফেসবুক গ্রুপ বা অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাসা খুঁজে থাকেন।
চীনে বিভিন্ন রেন্টাল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে সরাসরি বাসা খোঁজা যায়।
Wellcee — এজেন্ট ফি ছাড়াই বাসা খোঁজার প্ল্যাটফর্ম
Wellcee হলো চীনের একটি no-agent-fee rental platform, যেখানে বাড়িওয়ালা, বর্তমান ভাড়াটিয়া এবং সম্ভাব্য রুমমেটদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়।
এটি বিশেষ করে বিদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জন্য উপযোগী হতে পারে, কারণ এখানে ইংরেজি ইন্টারফেস ও চ্যাট ট্রান্সলেশনের সুবিধা রয়েছে।
চীনা ভাষা ভালো না জানলেও বিভিন্ন বাসার ছবি, অবস্থান এবং ভাড়ার তথ্য দেখে পছন্দের বাসা খুঁজতে পারবেন।
Wellcee-তে শেয়ার ফ্ল্যাট, সম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট এবং রুমমেট খোঁজার বিকল্পও রয়েছে।
প্ল্যাটফর্মটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, সরাসরি ভাড়ার ব্যবস্থায় প্রচলিত রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কমিশন দিতে হয় না।
বাংলাদেশ থেকে চীনে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে। কারণ টিউশন ফি, বিমানভাড়া এবং প্রাথমিক জীবনযাপনের খরচের পাশাপাশি অতিরিক্ত এজেন্ট কমিশন একটি বড় ব্যয় হতে পারে।
তবে যেকোনো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার সময় বাড়ির তথ্য, চুক্তির শর্ত এবং অর্থপ্রদানের বিষয় ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।

Beike ও Lianjia
Beike (贝壳) এবং Lianjia (链家) চীনের পরিচিত রিয়েল এস্টেট প্ল্যাটফর্ম।
এখানে বিভিন্ন শহরের অনেক বাসার বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। এজেন্টের মাধ্যমে বাসা দেখা এবং বাড়িওয়ালার সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে এজেন্ট কমিশন লাগতে পারে এবং অধিকাংশ তথ্য চীনা ভাষায় থাকে।
Ziroom
Ziroom (自如) একটি managed rental platform, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যায়।
কিছু বাসার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্যান্য ব্যবস্থাপনা সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
যাঁরা তুলনামূলকভাবে সাজানো-গোছানো বাসা চান, তাঁদের জন্য এটি সুবিধাজনক হতে পারে। তবে সার্ভিস ফি বা অতিরিক্ত চার্জ আছে কি না, আগে জেনে নিন।
বাসা চূড়ান্ত করার আগে একই এলাকায় অন্তত তিন থেকে পাঁচটি বিকল্প তুলনা করা ভালো।
চীনে বাসা ভাড়া নিতে শুরুতে কত টাকা লাগবে?
বাংলাদেশে অনেক সময় এক বা দুই মাসের অগ্রিম ভাড়া এবং জামানত দিয়ে বাসায় ওঠা যায়।
চীনে ভাড়ার নিয়ম কিছুটা আলাদা হতে পারে।
অনেক বাড়িওয়ালা একসঙ্গে তিন মাসের ভাড়া অগ্রিম নিতে চান। ফলে মাসিক ভাড়া কম মনে হলেও শুরুতে বড় অঙ্কের টাকা প্রস্তুত রাখতে হয়।
বাসার বিজ্ঞাপনে আপনি প্রায়ই একটি চীনা শব্দ দেখতে পাবেন:
押一付三 (Yā yī fù sān)
এর অর্থ হলো এক মাসের সিকিউরিটি ডিপোজিট এবং তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া।
ধরুন, আপনি মাসে ¥2,500 ভাড়ায় একটি বাসা পেলেন।
যদি বাড়িওয়ালা 押一付三 পদ্ধতিতে টাকা নেন, তাহলে আপনাকে শুরুতেই ¥2,500 জামানত এবং তিন মাসের ভাড়া হিসেবে ¥7,500 দিতে হবে।
অর্থাৎ বাসায় ওঠার আগে মোট ¥10,000 প্রস্তুত রাখতে হতে পারে।
এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট বা অন্যান্য সার্ভিস চার্জ যুক্ত হতে পারে।
কিছু বাসায় 押一付一 (Yā yī fù yī) ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এক মাসের জামানত এবং এক মাসের ভাড়া দিতে হয়, ফলে প্রাথমিক খরচ কিছুটা কম হয়।
স্কলারশিপ পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
আপনি যদি বৃত্তি নিয়ে চীনে যাচ্ছেন, তাহলে প্রথম মাসের খরচের জন্য আগে থেকেই কিছু অর্থের ব্যবস্থা রাখুন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি বা মাসিক স্টাইপেন্ড কখন থেকে দেওয়া শুরু হবে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে আলাদা হতে পারে।
আর বৃত্তিতে থাকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আপনি যদি নিজে বাইরে বাসা ভাড়া নিতে চান, তাহলে সেই খরচ বৃত্তি থেকে দেওয়া হবে কি না, নিশ্চিত করুন।
বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেটের খরচ
চীনের সব বাসায় ইউটিলিটি বিল ভাড়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ইন্টারনেট এবং বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট ফি আলাদাভাবে দিতে হয়।
এখানে দুটি চীনা শব্দ জানা কাজে আসবে।
-
民水民电 — আবাসিক ব্যবহারের পানি ও বিদ্যুতের тариф।
-
商水商电 — বাণিজ্যিক ব্যবহারের পানি ও বিদ্যুতের тариф, যা কিছু অ্যাপার্টমেন্টে বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে গ্রীষ্মে এয়ার কন্ডিশনার এবং শীতকালে হিটিং ব্যবহারের কারণে খরচ বাড়তে পারে।
তাই বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে শুধু মাসিক ভাড়া নয়, সব মিলিয়ে প্রকৃত মাসিক খরচ কত হবে, তা জেনে নিন।
ভাড়া, জামানত ও অন্যান্য খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের চীনে বাসা ভাড়া নেওয়ার প্রকৃত খরচের গাইড (ইংরেজিতে) পড়ুন।
৫. বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রান্নাঘর ও খাবারের ব্যবস্থা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে মেস বা হোস্টেলে থাকার সময় অনেক শিক্ষার্থী রান্না করে খান কিংবা বাইরে থেকে খাবার কিনে নেন।
চীনে এসে একই ব্যবস্থা সব জায়গায় পাওয়া যাবে, এমন নয়।
বিশেষ করে আপনি যদি নিয়মিত ভাত, ডাল, মাছ বা নিজের পছন্দমতো রান্না করতে চান, তাহলে বাসা নির্বাচন করার সময় রান্নাঘরের বিষয়টি গুরুত্ব দিন।
বাসায় রান্না করা যাবে কি?
কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে ব্যক্তিগত রুমে রান্না করার অনুমতি থাকে না।
অন্যদিকে শেয়ার ফ্ল্যাটে সাধারণত রান্নাঘর থাকে, তবে সেটি অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হতে পারে।
বাসা দেখার সময় জেনে নিন সেখানে গ্যাস বা ইন্ডাকশন চুলা আছে কি না, ফ্রিজ ব্যবহার করা যাবে কি না এবং রান্নাঘর ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে কি না।
হালাল ও নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা
আপনি যদি হালাল খাবার খান, তাহলে বাসার আশপাশে হালাল রেস্তোরাঁ বা প্রয়োজনীয় খাবারের দোকান আছে কি না, তা দেখে নিতে পারেন।
চীনে হালাল খাবারের দোকান খুঁজতে 清真 (Qīngzhēn) শব্দটি কাজে লাগবে।
এ ছাড়া নিরামিষভোজীদের জন্য আশপাশে সবজি, ফল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাবার সহজে পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা ভালো।
বিভিন্ন শহরে আন্তর্জাতিক বা দক্ষিণ এশীয় খাবারের দোকান ও মুদিপণ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে সব এলাকায় একই সুবিধা থাকবে না।
এ কারণে দীর্ঘ সময় থাকার পরিকল্পনা থাকলে শুধু বাসার ভাড়া নয়, আশপাশের বাজার ও খাবারের ব্যবস্থাও বিবেচনা করুন।
৬. বাসা দেখার সময় এবং চুক্তি করার আগে কী যাচাই করবেন?
অনলাইনে বাসার ছবি সুন্দর দেখালেও বাস্তবে অবস্থার পার্থক্য থাকতে পারে।
তাই সম্ভব হলে নিজে গিয়ে বাসা দেখুন।
আপনি যদি এখনো বাংলাদেশে থাকেন, তাহলে বাড়িওয়ালার কাছে লাইভ ভিডিও ট্যুর চাইতে পারেন। চীনে কোনো পরিচিত ব্যক্তি থাকলে তাঁর মাধ্যমেও বাসা যাচাই করা যায়।
বাসা দেখার সময় বাথরুম, পানির চাপ, ড্রেনেজ, দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব, দরজার তালা, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন এবং ইন্টারনেটের ব্যবস্থা ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।
ফার্নিশড বাসার ক্ষেত্রে কোন কোন আসবাবপত্র ভাড়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, সেটিও লিখিতভাবে নিশ্চিত করুন।
বাড়িওয়ালা আসলেই বাসা ভাড়া দেওয়ার অধিকার রাখেন কি?
চুক্তি করার আগে বাড়িওয়ালার পরিচয় এবং বাসাটির মালিকানা-সংক্রান্ত নথি যাচাই করুন।
কোনো বর্তমান ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে সাবলেট নিলে মূল বাড়িওয়ালার অনুমতি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
কেউ খুব কম ভাড়ায় বাসা দেওয়ার কথা বলে দ্রুত অগ্রিম টাকা পাঠাতে চাপ দিলে সতর্ক থাকুন।
রেন্টাল কন্ট্র্যাক্টে কী কী থাকতে হবে?
চুক্তিতে মাসিক ভাড়া, জামানতের পরিমাণ, টাকা দেওয়ার তারিখ, ভাড়ার মেয়াদ, মেরামতের দায়িত্ব এবং আগেভাগে বাসা ছেড়ে দেওয়ার শর্ত উল্লেখ থাকা উচিত।
জামানত কখন এবং কী শর্তে ফেরত দেওয়া হবে, সেটিও স্পষ্টভাবে লিখিত থাকতে হবে।
চুক্তি চীনা ভাষায় হলে পুরো বিষয় না বুঝে স্বাক্ষর করবেন না। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কোনো চীনা ভাষা জানা ব্যক্তির সাহায্য নিন।
আর বাসায় ওঠার দিন ঘরের ছবি ও ভিডিও তুলে রাখুন। আসবাবপত্রের অবস্থা এবং বিদ্যুৎ-পানির মিটারের রিডিংও সংরক্ষণ করুন।
ভবিষ্যতে জামানতের টাকা ফেরত নেওয়ার সময় এসব তথ্য কাজে আসতে পারে।
ভাড়ার চুক্তি, জামানত ও প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের বিদেশিদের জন্য চীনে বাসা ভাড়া সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর(ইংরেজিতে) পড়ুন।

৭. bKash, Nagad ও চীনের মোবাইল পেমেন্টের পার্থক্য
বাংলাদেশে আমরা bKash, Nagad, ব্যাংক ট্রান্সফার এবং অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত।
কিন্তু চীনে দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য সাধারণত Alipay (支付宝) এবং WeChat Pay (微信支付) ব্যবহার করা হয়।
দোকান, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ অনেক জায়গায় QR কোড স্ক্যান করে টাকা দেওয়া যায়।
বাড়িওয়ালার সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও WeChat বহুল ব্যবহৃত।
বাংলাদেশি মোবাইল ওয়ালেট দিয়ে কি চীনে বাসাভাড়া দেওয়া যাবে?
বাংলাদেশে ব্যবহৃত bKash বা Nagad-এর ওপর নির্ভর করে চীনে বাড়িওয়ালাকে সরাসরি ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করবেন না।
একইভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা পাঠকদেরও মনে রাখতে হবে, ভারতে ব্যবহৃত UPI সেবা চীনের স্থানীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার সরাসরি বিকল্প নয়।
চীনে যাওয়ার আগে আপনার ব্যাংকের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সুবিধা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের নিয়ম জেনে নেওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক Visa বা Mastercard ব্যবহার করা যাবে?
কিছু আন্তর্জাতিক Visa ও Mastercard Alipay বা WeChat Pay-এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
তবে এটি নির্ভর করে কার্ডের ধরন, ইস্যুকারী ব্যাংকের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট পেমেন্টের ওপর।
মনে রাখবেন, বিদেশি কার্ড দিয়ে দোকানে QR পেমেন্ট করা সম্ভব হলেও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানোর সুবিধা সব সময় পাওয়া যায় না।
ফলে বাসার জামানত বা কয়েক মাসের ভাড়া দেওয়ার জন্য আলাদা পেমেন্ট ব্যবস্থা লাগতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিদেশে পড়াশোনার খরচের জন্য অনুমোদিত ব্যাংকিং সুবিধা এবং ব্যক্তিগত বাসাভাড়া দেওয়ার অনুমোদিত পদ্ধতি এক বিষয় নয়। তাই ব্যাংকের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হোন।
চীনে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়েও খোঁজ নিতে পারেন।
বাড়িওয়ালাকে যেভাবেই টাকা দিন না কেন, প্রতিটি লেনদেনের রসিদ ও প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
চীনে যাওয়ার আগে পেমেন্টের ব্যবস্থা, মোবাইল সংযোগ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের চীনে যাওয়ার আগের প্রস্তুতির গাইড (ইংরেজিতে) পড়ুন।

৮. বিদেশিদের জন্য চীনে আবাসন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক
চীনে বাসা ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে হবে।
এটি হলো Accommodation Registration (住宿登记)।
আপনি যদি কোনো হোটেলের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বাসা বা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, তাহলে সাধারণত সেখানে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবাসন নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
বিদেশি নাগরিক নিজে অথবা যিনি তাঁকে থাকার জায়গা দিয়েছেন, তিনি এই নিবন্ধন করতে পারেন।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে চীনের National Immigration Administration দেশজুড়ে হোটেলের বাইরের আবাসনের জন্য অনলাইন নিবন্ধন সেবা চালু করেছে।
এখন NIA-এর সরকারি ওয়েবসাইট, NIA 12367 অ্যাপ এবং সংশ্লিষ্ট WeChat বা Alipay মিনি-প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিবন্ধন করা যায়।
স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
বাড়িওয়ালাকে কী জিজ্ঞেস করবেন?
বাসার চুক্তি করার আগে নিশ্চিত করুন, বাড়িওয়ালা বিদেশি নাগরিকের আবাসন নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় নথি দিতে এবং প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে পারবেন।
আপনি চীনা ভাষায় এভাবে জিজ্ঞেস করতে পারেন: 请问可以办理外国人住宿登记吗?
অর্থ: এই ঠিকানায় বিদেশি নাগরিকের আবাসন নিবন্ধন করা যাবে কি?
যদি বাড়িওয়ালা প্রয়োজনীয় নথি দিতে না পারেন, তাহলে টাকা দেওয়ার আগেই বিষয়টি পরিষ্কার করুন।
বাসার ঠিকানা পরিবর্তন করলে নতুন ঠিকানার নিবন্ধনও যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য X1 ও X2 ভিসা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
চীনে পড়াশোনার জন্য সাধারণত পড়াশোনার মেয়াদ অনুযায়ী X1 বা X2 ভিসা দেওয়া হয়।
X1 ভিসা সাধারণত ১৮০ দিনের বেশি সময়ের পড়াশোনার জন্য, আর X2 ভিসা ১৮০ দিন বা তার কম মেয়াদের পড়াশোনার জন্য ব্যবহৃত হয়।
X1 ভিসা নিয়ে চীনে প্রবেশ করলে সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে Residence Permit-এর জন্য আবেদন করতে হয়।
এ ছাড়া কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হলে আলাদা অনুমতি বা নিবন্ধন প্রয়োজন হতে পারে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের International Student Office-এর সঙ্গে আগে যোগাযোগ করুন। হোস্টেলের পরিবর্তে বাইরে বাসা নেওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
৯. চীনে রুমমেট খুঁজবেন কীভাবে?
চীনে শেয়ার ফ্ল্যাটে থাকলে মাসিক খরচ কমানো সম্ভব।
তবে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একই বাসায় ওঠার আগে কিছু বিষয় জেনে নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিজের দেশের পরিচিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এটি নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।
তবে শুধু একই দেশের মানুষ হলেই ভালো রুমমেট হবেন, এমন নয়।
রুমমেট খোঁজার সময় তাঁর দৈনন্দিন রুটিন, ঘর পরিষ্কার রাখার অভ্যাস, রান্নার ব্যবস্থা এবং অতিথি আসার নিয়ম সম্পর্কে আলোচনা করুন।
বিশেষ করে একই রান্নাঘর ব্যবহার করলে খাবার সংরক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রান্নার সময় নিয়ে আগেই বোঝাপড়া করে নেওয়া ভালো।
বাসাভাড়া ছাড়াও বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট এবং অন্যান্য বিল কীভাবে ভাগ করা হবে, তা পরিষ্কার করে নিন।
যদি বর্তমান ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে রুম নেন, তাহলে মূল ভাড়ার চুক্তি এবং সাবলেটের অনুমতি যাচাই করুন।
উপযুক্ত রুমমেট খোঁজা ও শেয়ার ফ্ল্যাটে থাকার বিষয়ে আরও জানতে আমাদের বিদেশি হিসেবে চীনে রুমমেট খোঁজার গাইড(ইংরেজিতে) পড়ুন।
১০. চীনে পৌঁছানোর প্রথম সপ্তাহে কী করবেন?
বাসা খুঁজে পাওয়ার পরও নতুন দেশে বসবাস শুরু করার জন্য কয়েকটি কাজ বাকি থাকে।
প্রথমেই যোগাযোগের জন্য একটি কার্যকর মোবাইল নম্বরের ব্যবস্থা করুন। চীনে স্থানীয় SIM কার্ড নেওয়া অনেক দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলে সময়মতো রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করুন।
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথি এবং বসবাস-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে যোগাযোগ রাখুন।
বাসায় ওঠার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে Accommodation Registration সম্পন্ন করুন।
বাড়িওয়ালার নম্বর, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্টের যোগাযোগ, রেন্টাল কন্ট্র্যাক্ট এবং টাকা দেওয়ার রসিদ সংরক্ষণ করুন।
এ ছাড়া বাসার ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ বিল এবং মেরামতের প্রয়োজনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, তা জেনে নিন।
আর সম্ভব হলে বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসের কাছাকাছি বাজার, হাসপাতাল, মেট্রো স্টেশন এবং প্রয়োজনীয় দোকানগুলো প্রথম সপ্তাহেই চিনে নিন।
চীনে পৌঁছানোর পর জরুরি কাজগুলো সেরে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ পেতে আমাদের চীনে প্রথম সপ্তাহের গাইড(ইংরেজিতে) পড়ুন।

চীনে বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে শেষ কিছু পরামর্শ
বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার চীনে যাওয়ার সময় বাসা খোঁজার প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল মনে হতে পারে।
তবে সঠিক তথ্য ও পরিকল্পনা থাকলে অনেক সমস্যাই আগে থেকে এড়ানো সম্ভব।
বাসা নির্বাচনের সময় শুধু কম ভাড়া দেখবেন না। বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসের দূরত্ব, অগ্রিম টাকা, রান্নাঘরের সুবিধা, বিদ্যুৎ-পানির খরচ, ভাড়ার চুক্তি এবং বিদেশি নাগরিকের আবাসন নিবন্ধনের ব্যবস্থা ভালোভাবে যাচাই করুন।
আপনি যদি অতিরিক্ত এজেন্ট কমিশন এড়িয়ে সরাসরি বাড়িওয়ালা বা রুমমেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান, তাহলে Wellcee-তে চীনের বিভিন্ন শহরের বাসা ও শেয়ার ফ্ল্যাট খুঁজে দেখতে পারেন।
মনে রাখবেন, ভালো বাসা মানে শুধু কম ভাড়ার বাসা নয়। এমন একটি জায়গা বেছে নেওয়া জরুরি, যেখানে আপনি নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারবেন এবং পড়াশোনা বা কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন।
সঠিক বাসা খুঁজে পাওয়াই হতে পারে চীনে আপনার নতুন জীবনের একটি সুন্দর শুরু।
